ইলেকট্রিক্যাল সাবস্টেশন(Substation)
ইলেকট্রিক্যাল সাবস্টেশন(Substation)
সাবস্টেশন (Substation) কাকে বলে?
সাবস্টেশন হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বা কেন্দ্র, যেখানে ভোল্টেজ পরিবর্তন (Step-up বা Step-down), পাওয়ার ফ্যাক্টর সংশোধন, বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন ইলেকট্রিক্যাল ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হয়।
সহজ কথায়, পাওয়ার প্ল্যান্টে যে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তা সরাসরি আমাদের বাসায় আসার উপযোগী থাকে না। সাবস্টেশন সেই বিদ্যুৎকে প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চ ভোল্টেজ থেকে নিম্ন ভোল্টেজে রূপান্তর করে এবং বিভিন্ন ফিডারের মাধ্যমে নিরাপদে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়।
সাবস্টেশনের উপাদান:
১. পাওয়ার ট্রান্সফর্মার (Power Transformer)
২. ইনস্ট্রুমেন্ট ট্রান্সফর্মার (Instrument Transformers)
৩. বাস-বার (Bus-bar)
৪. সুইচগিয়ার ও প্রোটেকশন ডিভাইস (Switchgear & Protection)
৫. প্রোটেক্টিভ ও সাপোর্টিং ইকুইপমেন্ট
৬. অক্সিলারি সিস্টেম (Auxiliary Systems)
৭. অন্যান্য উপাদান(ক্যাপাসিটর ব্যাংক,ওয়েভ ট্র্যাপ (Wave Trap)
এবার সাবস্টেশনের উপাদানগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
১. পাওয়ার ট্রান্সফর্মার (Power Transformer)
কোর (Core):
এটি সিলিকন স্টিলের পাতলা ল্যামিনেশন দিয়ে তৈরি। এর কাজ হলো ম্যাগনেটিক ফ্লাক্স চলাচলের জন্য একটি সহজ পথ তৈরি করা এবং এডি কারেন্ট লস (Eddy Current Loss) কমানো।
উইন্ডিং (Windings):
Primary Winding: যেখানে ইনপুট পাওয়ার দেওয়া হয়।
Secondary Winding: যেখান থেকে আউটপুট পাওয়ার নেওয়া হয়।
সাধারণত কপার বা অ্যালুমিনিয়ামের কন্ডাক্টর ব্যবহার করা হয়।
কনজারভেটর ট্যাংক (Conservator Tank):
ট্রান্সফরমারের উপরে একটি ছোট ড্রাম থাকে। লোড বাড়লে তেল গরম হয়ে প্রসারিত হয়, তখন এই ট্যাংকে তেলের বাড়তি জায়গা হয়। আবার তেল ঠান্ডা হলে এখান থেকে তেল নিচে নেমে আসে।
বুকহোলজ রিলে (Buchholz Relay):
এটি একটি গ্যাস-অ্যাকচুয়েটেড প্রোটেক্টিভ রিলে। ট্রান্সফরমারের ভেতরে কোনো ইন্টারনাল ফল্ট (যেমন: শর্ট সার্কিট বা আর্কিং) হলে এটি অ্যালার্ম দেয় বা সার্কিট ট্রিপ করে। এটি মেইন ট্যাংক ও কনজারভেটর ট্যাংকের মাঝখানের পাইপে থাকে।
ব্রিদার (Breather):
তেল যখন প্রসারিত বা সংকুচিত হয়, তখন বাইরের বাতাস ভেতরে ঢোকে বা বের হয়। এই বাতাসের আর্দ্রতা শুষে নেওয়ার জন্য ব্রিদারে সিলিকা জেল (Silica Gel) থাকে। ভালো সিলিকা জেলের রং নীল, আর আর্দ্রতা শুষে নিলে এটি গোলাপি হয়ে যায়।
বুশিং (Bushings):
এটি ইনসুলেটর যা ট্রান্সফরমারের ভেতরের উইন্ডিং থেকে কন্ডাক্টরকে বাইরে নিয়ে আসে এবং বডির সাথে ইনসুলেশন নিশ্চিত করে।
লস বা অপচয়সমূহ(Loss):
ট্রান্সফরমারে মূলত দুই ধরনের লস হয়:
Iron Loss (Core Loss): এটি লোডের ওপর নির্ভর করে না (ধ্রুবক)। এটি দু’প্রকার— হিস্টোরিসিস লস ও এডি কারেন্ট লস।
Copper Loss: এটি লোডের ওপর নির্ভর করে। কারেন্ট বাড়লে এই লস বাড়ে ($I^2R$ সূত্রানুযায়ী)।
পাওয়ার ট্রান্সফরমারের বৈশিষ্ট্য
এর দক্ষতা বা এফিসিয়েন্সি সাধারণত অনেক বেশি থাকে (৯৮% - ৯৯%)।
এটি সবসময় ফুল লোডে (Full Load) চালানোর জন্য ডিজাইন করা হয়।
পাওয়ার ট্রান্সফরমারের রেটিং সাধারণত MVA (Mega Volt-Ampere) এককে প্রকাশ করা হয়।
ঠিক আছে, একবারে পাওয়ার ট্রান্সফরমারের সব গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি এবং অ্যাডভান্সড টপিকগুলো নিচে ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এগুলোই আপনার ‘কমপ্লিট গাইড’ হিসেবে কাজ করবে।
ট্রান্সফরমার কুলিং পদ্ধতি (Cooling Methods)
ট্রান্সফরমার ফুল লোডে চললে উইন্ডিং ও কোর প্রচুর গরম হয়। এই তাপ বের করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে:
ONAN (Oil Natural Air Natural): তেলের সংবহন এবং বাইরের বাতাস—উভয়ই স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। ছোট ট্রান্সফরমারে ব্যবহৃত হয়।
ONAF (Oil Natural Air Forced): তেল স্বাভাবিক থাকে কিন্তু বাইরে ফ্যান দিয়ে বাতাস দেওয়া হয়।
OFAF (Oil Forced Air Forced): পাম্প দিয়ে তেল এবং ফ্যান দিয়ে বাতাস—উভয়ই জোরপূর্বক সঞ্চালন করা হয়। বড় পাওয়ার ট্রান্সফরমারে এটি দেখা যায়।
OFWF (Oil Forced Water Forced): তেলের তাপ কমাতে পানির সংবহন ব্যবহার করা হয়।
একাধিক ট্রান্সফরমারকে একসাথে প্যারালালে চালাতে হলে ৪টি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হয় (পরীক্ষায় খুব আসে):
একই পোলারিটি (Same Polarity): পোলারিটি ভুল হলে শর্ট সার্কিট হবে।
একই ভোল্টেজ রেশিও (Same Voltage Ratio): রেশিও ভিন্ন হলে সার্কুলেটিং কারেন্ট প্রবাহিত হবে।
একই ফেজ সিকোয়েন্স (Same Phase Sequence): থ্রি-ফেজ ট্রান্সফরমারের ক্ষেত্রে এটি আবশ্যিক।
একই পার-ইউনিট ইমপেডেন্স ($Z_{pu}$): লোড যেন সমানভাবে ভাগ হয় (Load Sharing) তার জন্য এটি প্রয়োজন।
থ্রি-ফেজ ট্রান্সফরমারে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি উইন্ডিংয়ের মধ্যে যে ফেজ ডিফারেন্স থাকে, তাকে ভেক্টর গ্রুপ বলে।
Ynd11: এর মানে প্রাইমারি Star (Y), সেকেন্ডারি Delta (d) এবং এদের মধ্যে ফেজ ডিফারেন্স ৩০° (ঘড়ির ১১টার কাঁটার অবস্থানে)। এটি জেনারেশন স্টেশনে বেশি ব্যবহৃত হয়।
Dyn11: প্রাইমারি Delta (D) এবং সেকেন্ডারি Star (y)। ডিস্ট্রিবিউশন সাবস্টেশনে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় কারণ এতে নিউট্রাল (Neutral) পাওয়া যায়।
ট্রান্সফরমারে মূলত মিনারেল অয়েল বা ন্যাপথেনিক অয়েল ব্যবহার করা হয়। একে পাইরানলও বলা হয়। এর দুটি কাজ:
ইনসুলেশন (Insulation): কন্ডাক্টরগুলোর মধ্যে অন্তরক হিসেবে কাজ করে।
কুলিং (Cooling): উৎপন্ন তাপ শুষে নিয়ে বাইরে ছড়িয়ে দেয়।
ডাই-ইলেকট্রিক স্ট্রেংথ: ভালো তেলের ডাই-ইলেকট্রিক স্ট্রেংথ অন্তত ৩০ kV/mm বা তার বেশি হতে হয়।
বুকহোলজ রিলে: আগেই বলেছি, এটি গ্যাসের চাপে কাজ করে এবং ইন্টারনাল ফল্টে সিগন্যাল দেয়।
ডিফারেনশিয়াল রিলে (Differential Relay): এটি ট্রান্সফরমারের ইনপুট ও আউটপুট কারেন্টের তুলনা করে। কারেন্টের পার্থক্য থাকলেই এটি ট্রিপ করে। এটি বড় ট্রান্সফরমারের প্রধান প্রোটেকশন।
প্রেসার রিলিফ ভালভ (PRV): ট্যাংকের ভেতর অতিরিক্ত গ্যাস জমে চাপ বেড়ে গেলে এটি ফেটে গিয়ে ট্যাংক রক্ষা করে।
অয়েল/উইন্ডিং টেম্পারেচার ইন্ডিকেটর (OTI/WTI): তেলের এবং কয়েলের তাপমাত্রা মাপার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
ভোল্টেজ রেগুলেশন: নো-লোড এবং ফুল-লোড ভোল্টেজের পার্থক্য। পাওয়ার ট্রান্সফরমারে এটি কম হওয়া ভালো (আদর্শ মান ২% থেকে ৫%)।
ম্যাক্সিমাম এফিসিয়েন্সি শর্ত: যখন Iron Loss = Copper Loss হয়, তখন ট্রান্সফরমার সর্বোচ্চ দক্ষতায় কাজ করে।
ভোল্টেজ কমানো বা বাড়ানোর জন্য ট্রান্সফরমারের হাই-ভোল্টেজ সাইডে ট্যাপ চেঞ্জার থাকে।
NLTC (No Load Tap Changer): লোড বিচ্ছিন্ন করে ভোল্টেজ পরিবর্তন করতে হয়।
OLTC (On Load Tap Changer): বিদ্যুৎ সচল থাকা অবস্থাতেই ভোল্টেজ এডজাস্ট করা যায়। সাবস্টেশনে এটিই বেশি ব্যবহৃত হয়।
২. ইনস্ট্রুমেন্ট ট্রান্সফর্মার (Instrument Transformers)
ইন্সট্রুমেন্ট ট্রান্সফরমার হলো এমন এক ধরণের বিশেষ ট্রান্সফরমার যা হাই-ভোল্টেজ এবং হাই-কারেন্টকে একটি নিরাপদ এবং পরিমাপযোগ্য মানে (সাধারণত 5A বা 110V) নামিয়ে আনে। এটি মূলত মেজারমেন্ট (পরিমাপ) এবং প্রোটেকশন (সুরক্ষা) এর কাজে ব্যবহৃত হয়।
নিচে ইন্সট্রুমেন্ট ট্রান্সফরমারের প্রধান দুই প্রকারভেদ— Current Transformer (CT) এবং Potential Transformer (PT) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
নিচে ইন্সট্রুমেন্ট ট্রান্সফরমারের প্রধান দুই প্রকারভেদ— Current Transformer (CT) এবং Potential Transformer (PT) সম্পর্কে গভীর আলোচনা করা হলো:
1. কারেন্ট ট্রান্সফরমার (Current Transformer - CT)
এটি সার্কিটের সাথে সিরিজে (Series) যুক্ত থাকে এবং উচ্চ মানের কারেন্টকে কমিয়ে এনে অ্যামিটার বা রিলের উপযোগী করে তোলে।
বিবর্তক অনুপাত (Turns Ratio): এটি মূলত একটি Step-up ট্রান্সফরমার (ভোল্টেজের দিক থেকে)। কারণ প্রাইমারিতে মাত্র ১ বা ২টি প্যাঁচ থাকে এবং সেকেন্ডারিতে অনেক প্যাঁচ থাকে। সেকেন্ডারিতে ভোল্টেজ বাড়লে কারেন্ট কমে যায়।
সেকেন্ডারি রেটিং: সিটির সেকেন্ডারি কারেন্ট সাধারণত 5A বা 1A হয়। (যেমন: ১০০:৫ বা ২০০:১)।
সতর্কতা (খুবই গুরুত্বপূর্ণ): সিটির সেকেন্ডারি কখনও খোলা (Open) রাখা উচিত নয়। যদি অ্যামিটার বা রিলে খোলা হয়, তবে সেকেন্ডারিকে অবশ্যই শর্ট (Short) করে দিতে হবে। তা না হলে হাই-ভোল্টেজ তৈরি হয়ে ইনসুলেশন নষ্ট হতে পারে বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
ব্যবহার: কারেন্ট পরিমাপ (Ammeter) এবং ওভার-কারেন্ট প্রোটেকশন রিলেতে।
2. পটেনশিয়াল ট্রান্সফরমার (Potential Transformer - PT)
এটি হাই-ভোল্টেজ লাইনের সাথে প্যারালালে (Parallel) যুক্ত থাকে এবং ভোল্টেজ কমিয়ে ভোল্টমিটার বা রিলের উপযোগী করে।
ধরন: এটি একটি Step-down ট্রান্সফরমার। এর প্রাইমারিতে অনেক প্যাঁচ থাকে এবং সেকেন্ডারিতে কম প্যাঁচ থাকে।
সেকেন্ডারি রেটিং: এর সেকেন্ডারি ভোল্টেজ সাধারণত 110V হয়। (যেমন: ১১কেভি:১১০ভি)।
কাজের নীতি: এটি সাধারণ পাওয়ার ট্রান্সফরমারের মতোই কাজ করে, তবে এর রেটিং বা সাইজ অনেক ছোট হয় (সাধারণত ২০০ভিএ থেকে ৫০০ভিএ পর্যন্ত)।
ব্যবহার: ভোল্টেজ পরিমাপ (Voltmeter) এবং আন্ডার/ওভার ভোল্টেজ প্রোটেকশন রিলেতে।
3. CT ও PT-এর মধ্যে মূল পার্থক্য (Quick Comparison)
| বৈশিষ্ট্য | কারেন্ট ট্রান্সফরমার (CT) | পটেনশিয়াল ট্রান্সফরমার (PT) |
| সংযোগ | লাইনের সাথে সিরিজে যুক্ত। | লাইনের সাথে প্যারালালে যুক্ত। |
| কাজ | কারেন্ট কমায়। | ভোল্টেজ কমায়। |
| সেকেন্ডারি অবস্থা | কখনই ওপেন রাখা যাবে না। | ওপেন রাখা যায় (শর্ট করা যাবে না)। |
| প্রাইমারি প্যাঁচ | খুব কম (১টি বা ২টি)। | অনেক বেশি। |
| আদর্শ রেটিং | 5A বা 1A। | 110V। |
Q."CT সেকেন্ডারি ওপেন রাখলে কি হয়?"—এর উত্তর হবে "অত্যধিক কোর স্যাচুরেশন এবং হাই-ভোল্টেজের কারণে ইনসুলেশন ফেল হতে পারে।"
৩.বাসবার(Busbar)
বাসবার (Busbar) হলো বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য উপাদান। এটি মূলত একটি পরিবাহী ধাতু (সাধারণত কপার বা অ্যালুমিনিয়াম), যা একাধিক সার্কিট থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে এবং অন্য সার্কিটগুলোতে বিতরণ করে।
সহজ কথায়, একটি সাবস্টেশন বা প্যানেল বোর্ডে যেখানে অনেকগুলো ইনকামিং এবং আউটগোয়িং কানেকশন এসে মিলিত হয়, সেই কমন পয়েন্টটিই হলো বাসবার।
বাসবারের কাজ:
বিদ্যুৎ সংগ্রহ: জেনারেটর বা ট্রান্সফর্মার থেকে আসা বিদ্যুৎ এটি গ্রহণ করে।
বিদ্যুৎ বিতরণ: ফিডার লাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন লোডে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়।
সিস্টেম সহজ করা: অসংখ্য তারের জট কমিয়ে সংযোগ ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ও সহজবোধ্য করে।
বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং বড় শিল্পকারখানার ইলেকট্রিক্যাল প্যানেলে বাসবার একটি মেরুদণ্ডের মতো কাজ করে। এটি যেমন সিস্টেমের কার্যকারিতা বাড়ায়, তেমনি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও নমনীয় করে তোলে।
৪. সুইচগিয়ার ও প্রোটেকশন ডিভাইস (Switchgear & Protection)
সাবস্টেশনে সুইচগিয়ার (Switchgear) এবং প্রোটেকশন (Protection) ডিভাইসগুলো মূলত একটি সিস্টেমের পাহারা এবং নিয়ন্ত্রণকারীর মতো কাজ করে। বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা, সরঞ্জাম রক্ষা করা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর প্রধান কাজ।
নিচে সুইচগিয়ার ও প্রোটেকশন ডিভাইসগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
1. সুইচগিয়ার (Switchgear) কী?
সুইচগিয়ার হলো সুইচিং, কন্ট্রোলিং এবং প্রোটেক্টিং ডিভাইসের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। এর কাজ হলো স্বাভাবিক অবস্থায় বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অস্বাভাবিক অবস্থায় (যেমন শর্ট সার্কিট) বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা।
প্রধান উপাদানসমূহ:
সার্কিট ব্রেকার (Circuit Breaker): এটি সুইচগিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফল্ট দেখা দিলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সাবস্টেশনে ভোল্টেজ ভেদে VCB (Vacuum), SF6, বা Air Circuit Breaker ব্যবহৃত হয়।
আইসোলেটর (Isolator): এটি একটি অফ-লোড সুইচ। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করার সময় সার্কিটকে ফিজিক্যালি আলাদা করতে এটি ব্যবহৃত হয়।
বাসবার (Busbar): এটি কমন কানেকশন পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে যেখান থেকে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়।
লোড ব্রেক সুইচ (Load Break Switch): এটি লোড থাকা অবস্থায় ম্যানুয়ালি সার্কিট অন বা অফ করতে ব্যবহৃত হয়।
2. প্রোটেকশন ডিভাইস (Protection Devices)
প্রোটেকশন সিস্টেম মূলত ত্রুটি শনাক্ত করে এবং সুইচগিয়ারকে (সার্কিট ব্রেকার) নির্দেশ দেয় যেন সে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
প্রধান উপাদানসমূহ:
রিলে (Relay): এটি সিস্টেমের "মস্তিষ্ক"। যদি কোথাও কারেন্ট বা ভোল্টেজ অস্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে রিলে তা শনাক্ত করে সার্কিট ব্রেকারের ট্রিপ কয়েলে সংকেত পাঠায়।
প্রকারভেদ: ওভার-কারেন্ট রিলে, ডিফারেনশিয়াল রিলে, ডিসটেন্স রিলে ইত্যাদি।
ইনস্ট্রুমেন্ট ট্রান্সফরমার (CT & PT):
Current Transformer (CT): উচ্চমাত্রার কারেন্টকে কমিয়ে পরিমাপযোগ্য মানে আনে এবং রিলেতে ফিড করে।
Potential Transformer (PT): উচ্চমাত্রার ভোল্টেজকে কমিয়ে রিলে এবং মিটারের উপযোগী করে।
লাইটনিং অ্যারেস্টার (Lightning Arrester): বজ্রপাত বা আকস্মিক হাই ভোল্টেজ (Surge) থেকে সাবস্টেশনের সরঞ্জামকে রক্ষা করতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ মাটিতে পাঠিয়ে দেয়।
ফিউজ (Fuse): ক্ষুদ্র বা মাঝারি ভোল্টেজে অতিরিক্ত কারেন্ট প্রবাহিত হলে এটি গলে গিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
সুইচগিয়ার ও প্রোটেকশন কীভাবে কাজ করে?
একটি সিস্টেমে যখন ফল্ট ঘটে, তখন প্রক্রিয়াটি নিচের ধাপগুলোতে সম্পন্ন হয়:
শনাক্তকরণ: CT বা PT লাইনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন রিলেকে জানায়।
বিশ্লেষণ: রিলে নির্ধারিত মানের সাথে তুলনা করে দেখে যে এটি ফল্ট কি না।
নির্দেশ: রিলে সার্কিট ব্রেকারকে 'Trip' সিগন্যাল পাঠায়।
বিচ্ছিন্নকরণ: সার্কিট ব্রেকার তার কন্টাক্ট খুলে দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ অংশকে মেইন গ্রিড থেকে আলাদা করে ফেলে।
কেন এটি সাবস্টেশনে অপরিহার্য?
সরঞ্জাম সুরক্ষা: দামী ট্রান্সফরমার বা জেনারেটরকে পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ: সিস্টেমের এক অংশে সমস্যা হলে শুধু সেই অংশটিই বিচ্ছিন্ন হয়, বাকি অংশে বিদ্যুৎ সচল থাকে।
নিরাপত্তা: সাবস্টেশনে কর্মরত অপারেটর এবং জনসাধারণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
ফল্ট লোকালাইজেশন: কোথায় সমস্যা হয়েছে তা দ্রুত খুঁজে বের করতে সাহায্য করে।
সুইচগিয়ার এবং প্রোটেকশন সিস্টেম ছাড়া আধুনিক পাওয়ার সিস্টেম কল্পনা করা অসম্ভব, কারণ এটি ছাড়া যেকোনো ছোট ত্রুটি পুরো দেশের গ্রিডকে অচল করে দিতে পারে।
সাবস্টেশনের সুরক্ষা এবং পরিচালনার জন্য ৫, ৬ এবং ৭ নম্বর পয়েন্টগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
৫. প্রোটেক্টিভ ও সাপোর্টিং ইকুইপমেন্ট (Protective & Supporting Equipment)
সাবস্টেশনের মূল যন্ত্রপাতিগুলোকে যান্ত্রিক এবং বৈদ্যুতিকভাবে ধরে রাখা এবং সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এগুলো ব্যবহৃত হয়।
ইন্সুলেটর (Insulator): এটি বিদ্যুৎবাহী পরিবাহীকে (যেমন বাসবার বা তার) সাবস্টেশনের স্টিল স্ট্রাকচার থেকে আলাদা রাখে। এটি সাধারণত পোরসেলিন বা পলিমার দিয়ে তৈরি।
আর্থিং সুইচ (Earthing Switch): কোনো লাইনে কাজ করার আগে সার্কিট ব্রেকার ও আইসোলেটর খোলার পর লাইনে জমে থাকা স্ট্যাটিক চার্জ মাটিতে পাঠিয়ে দিতে এটি ব্যবহৃত হয়। এটি কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
আর্থিং গ্রিড (Earthing Grid): সাবস্টেশনের মাটির নিচে তামা বা লোহার পাতের একটি জাল থাকে। বজ্রপাত বা শর্ট সার্কিট কারেন্টকে নিরাপদে মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়াই এর কাজ।
ফেন্সিং বা বেষ্টনী (Fencing): সাবস্টেশনের চারপাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বাইরের মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে এটি ব্যবহার করা হয়।
৬. অক্সিলারি সিস্টেম (Auxiliary Systems)
সাবস্টেশন পরিচালনার জন্য যে বাড়তি সাপোর্ট সিস্টেমগুলোর প্রয়োজন হয়, তাকে অক্সিলারি সিস্টেম বলে।
ব্যাটারি ব্যাংক ও ডিসি সিস্টেম (Battery Bank & DC System): এটি সাবস্টেশনের "হার্টবিট"। সাবস্টেশনের রিলে এবং সার্কিট ব্রেকারগুলো এসি (AC) কারেন্টে চলে না, বরং ডিসি (DC) কারেন্টে চলে। যদি মেইন পাওয়ার চলে যায়, তবুও যেন প্রোটেকশন সিস্টেম কাজ করে, তাই ২৪ বা ১১০ ভোল্টের ব্যাটারি ব্যাংক ব্যাকআপ হিসেবে থাকে।
অক্সিলারি ট্রান্সফরমার (Auxiliary Transformer): এটি একটি ছোট স্টেপ-ডাউন ট্রান্সফরমার। সাবস্টেশনের ভেতরের লাইটিং, ফ্যান, এসি এবং কন্ট্রোল প্যানেলের এসি পাওয়ারের চাহিদা মেটাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম (Fire Fighting System): ট্রান্সফরমারে প্রচুর পরিমাণে ইনসুলেটিং অয়েল থাকে, যা দাহ্য। তাই আগুন নেভানোর জন্য বিশেষ এমালশন সিস্টেম বা CO2 সিলিন্ডার রাখা হয়।
৭. অন্যান্য উপাদান (Other Components)
সিস্টেমের মান এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখতে এই উপাদানগুলো দরকার হয়।
লাইটনিং অ্যারেস্টার (Lightning Arrester - LA):
কাজ: বজ্রপাত বা আকস্মিক হাই ভোল্টেজ (Surge) থেকে সিস্টেমকে রক্ষা করা।
অবস্থান: এটি ইনকামিং লাইনের শুরুতে এবং ট্রান্সফরমারের ঠিক আগে প্যারালালে বসানো হয়। উচ্চ ভোল্টেজ আসলে এটি মুহূর্তেই তার রোধ কমিয়ে বিদ্যুৎ মাটিতে পাঠিয়ে দেয়।
ক্যাপাসিটর ব্যাংক (Capacitor Bank):
কাজ: এটি সিস্টেমের পাওয়ার ফ্যাক্টর (Power Factor) উন্নত করে।
সুবিধা: এর ফলে লাইনের ভোল্টেজ ড্রপ কমে এবং সিস্টেমের দক্ষতা বা এফিসিয়েন্সি বাড়ে।
ওয়েভ ট্র্যাপ (Wave Trap):
কাজ: পাওয়ার লাইনের ভেতর দিয়ে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির ডাটা বা ভয়েস সিগন্যাল পাঠানোর জন্য (PLCC সিস্টেম) এটি ব্যবহৃত হয়। এটি হাই ফ্রিকোয়েন্সি সিগন্যালকে সাবস্টেশনের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয় এবং নির্দিষ্ট পথে পাঠিয়ে দেয়।


No comments