রহস্য গল্পঃ উন্মোচন
উন্মোচন
শহরের ঘড়িতে তখন রাত দুইটা। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। আকাশ তার পুরনো ধুলোবালি মাখা পাঞ্জাবিটা পরে মোড় পার হচ্ছিল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়া নেই, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে আছে অদ্ভুত এক সতর্কতা। আকাশের পকেটে কোনো টাকা নেই, আছে কেবল একটা পুরনো কয়েন আর একটা দিয়াশলাই।
হঠাৎ একটা দ্রুতগামী মাইক্রোবাস তার পাশে এসে ব্রেক কষল। দরজা খুলে দুজন লোক তাকে প্রায় জোর করেই ভেতরে টেনে তুলল। আকাশের মুখে কোনো ভয়ের চিহ্ন দেখা গেল না। সে শান্ত গলায় বলল, "আপনারা একটু দেরি করে ফেলেছেন। আমি আশা করেছিলাম আপনারা রাত একটার দিকে আসবেন।"
লোক দুজন চমকে উঠল। তাদের একজন, যার নাম জহির, কর্কশ গলায় বলল, "তুই কেমনে জানলি আমরা আসব?"
আকাশ হাসল। "আপনাদের গাড়ির টায়ার থেকে যে শব্দ হচ্ছে, সেটা আমি গত দশ মিনিট ধরে শুনছিলাম। আর আপনার গায়ের থেকে আসা দামী সেন্টের গন্ধ বলছে যে আপনারা কোনো সাধারণ চোর নন। আপনারা বড় কোনো বিপদে পড়েছেন।"
#১
গাড়িটা গিয়ে থামল শহরের বাইরের এক পরিত্যক্ত বাংলোর সামনে। আকাশকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে বসে আছেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, যার নাম চৌধুরী সাহেব। তার সামনে একটা কালো সুটকেস খোলা। সুটকেসের ভেতরে কোনো টাকা নেই, আছে অদ্ভুত কিছু নথিপত্র আর একটা ছোট্ট কাঁচের শিশি।
চৌধুরী সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, "আকাশ, তোমার নাম শুনেছি। লোকে বলে তুমি নাকি মানুষের চেহারা দেখে বলে দিতে পারো সে কী লুকাচ্ছে। এই সুটকেসটা আমার অফিসের লকার থেকে সরানো হয়েছিল। এখন এটা ফেরত পেয়েছি, কিন্তু ভেতরের আসল জিনিসটা গায়েব। তুমি কি বলতে পারো চোর কে?"
আকাশ সুটকেসটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে নথিপত্রগুলো হাত দিয়ে স্পর্শ করল না। কেবল নাকে এক ধরণের ঘ্রাণ নিল। তারপর বলল, "চৌধুরী সাহেব, আপনার এই রুমে এসি চলছে, কিন্তু আপনার কপালে ঘাম। আপনি ভয় পাচ্ছেন। আপনি কি জানেন, চোর আপনার খুব কাছের কেউ?"
চৌধুরী সাহেবের চোখ সংকুচিত হয়ে এল। "কীভাবে বুঝলে?"
"এই সুটকেসের হাতলে খুব হালকা একটা পাউডারের গুঁড়ো লেগে আছে। এটা কোনো সাধারণ পাউডার নয়, এটা এক ধরণের দামী কসমেটিকস যা কেবল মহিলারাই ব্যবহার করেন।"
#২
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের আলো নিভে গেল। বাইরে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়েছে। অন্ধকারের মাঝেই একটা কান্নার শব্দ শোনা গেল। আকাশের দিয়াশলাই জ্বলার শব্দ হলো। ছোট সেই শিখার আলোয় দেখা গেল দরজার কোণে দাঁড়িয়ে আছে চৌধুরী সাহেবের একমাত্র মেয়ে, নীলিমা।
নীলিমা কাঁপছে। তার হাতে সেই কাঁচের শিশিটা। আকাশ শান্ত পায়ে নীলিমার দিকে এগিয়ে গেল।
"নীলিমা, তুমি কি জানো এই শিশির ভেতরে যা আছে তা তোমার বাবার জীবন বাঁচাতে পারে, আবার ধ্বংসও করতে পারে?"
নীলিমা চিৎকার করে বলল, "বাবা এই বিষ দিয়ে অনেক মানুষকে শেষ করে দিয়েছেন। আমি চাই না এই পাপ আমাদের পরিবারে থাকুক!"
চৌধুরী সাহেব গর্জে উঠলেন, "নীলিমা! ওটা আমাকে দাও!"
আকাশ ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে নীলিমার হাত থেকে শিশিটা নিল না, বরং আলতো করে নীলিমার মাথায় হাত রাখল।
চৌধুরী সাহেব চিৎকার করে বললেন, "আকাশ, শিশিটা ওর কাছ থেকে কেড়ে নাও!"
আকাশ নির্লিপ্ত গলায় বলল, "শিশিটা ওর কাছেই থাকুক চাচা। কারণ চুরির নাটকটা নীলিমা করেনি, করেছেন আপনি নিজে।"
পুরো ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। জহির আর চৌধুরী সাহেব পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। আকাশ পকেট থেকে সেই পুরনো কয়েনটা বের করে টেবিলে রাখল।
"চৌধুরী সাহেব, আপনি জানতেন যে আপনার ব্যবসার পার্টনাররা আপনার ওপর নজর রাখছে। আপনি সুটকেস থেকে আসল নথিগুলো সরিয়ে নিজের লকারেই লুকিয়ে রেখেছেন। আর এই শিশিটা, যেটাকে নীলিমা বিষ ভাবছে— এটা আসলে আপনার ইনসুলিন। আপনি নীলিমাকে দিয়ে এই চুরির নাটকটা সাজিয়েছেন যাতে সবার নজর আপনার থেকে সরে গিয়ে নীলিমার ওপর পড়ে। আপনি নিজের মেয়েকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।"
আকাশ জহিরের দিকে তাকিয়ে বলল, "আর জহির ভাই, আপনি ভাবছিলেন আপনি চৌধুরী সাহেবকে ব্ল্যাকমেইল করছেন? ভুল। চৌধুরী সাহেব আপনাকে দিয়ে আমাকে এখানে আনিয়েছেন যাতে আমি এসে নীলিমাকে দোষী প্রমাণ করি এবং তিনি সবার চোখে সাধু হয়ে যান।"
আকাশ চৌধুরী সাহেবের দিকে তাকিয়ে এক টুকরো করুণার হাসি হাসল। "কিন্তু আপনি ভুলে গেছেন চৌধুরী সাহেব, আমি মানুষের চোখের পাতা পড়া গুনি না, আমি মানুষের ভয়টা গুনি। আপনি নিজের মেয়েকে চোর সাজানোর সময় তার মেকআপের পাউডার সুটকেসে মাখাতে ভুলে গিয়েছিলেন, যেটা আমি আগেই খেয়াল করেছি।"
#৪
চৌধুরী সাহেব কোনো কথা বলতে পারলেন না। তার সাজানো দাবার ঘুঁটিগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। নীলিমা স্তম্ভিত হয়ে তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। সে আজ নিজের বাবার আসল রূপটা দেখতে পেল।
আকাশ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে বৃষ্টির মধ্যে বাংলো থেকে বেরিয়ে এল। জহির তাকে আটকানোর সাহস পেল না। মানুষের মিথ্যে যখন একদম নগ্ন হয়ে সামনে আসে, তখন মিথ্যেবাদীরা কুঁকড়ে যায়।
আকাশ আবার সেই বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় নামল। তার পায়ে জুতো নেই। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় তার ছায়াটা দীর্ঘ হয়ে পড়ছে।
সে জানে, আজ রাতটা অনেক মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। চৌধুরী সাহেব হয়তো এখন আইনি জটিলতায় পড়বেন, নীলিমা হয়তো ঘর ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু আকাশের তাতে কিছু যায় আসে না। তার কাজ ছিল আয়নাটা চোখের সামনে ধরা, সে সেটা ধরেছে।
সে পকেট থেকে দিয়াশলাই বের করে জ্বালানোর চেষ্টা করল। শেষ কাঠিটা জ্বলে উঠল। আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করল, "মানুষ নিজেকে বাঁচাতে কতটুকু নিচে নামতে পারে! অদ্ভুত, সত্যিই অদ্ভুত!"
হঠাৎ দূরে একটা কুকুরের ডাক শোনা গেল। আকাশ সেই অন্ধকারের দিকে হাঁটা ধরল। তার কোনো গন্তব্য নেই, কিন্তু তার কাছে সারা পৃথিবীটাই এখন এক মস্ত বড় রঙ্গমঞ্চ।


No comments