মায়াজালের নকশা
হুমায়ুন আহমেদের 'হিমু' চরিত্র অবলম্বনে রচিত।
মায়াজালের নকশা
মাজেদা খালার মেজাজ আজ সপ্তমে চড়ে আছে। কারণটা খুব সাধারণ—আমি দুপুরবেলা খালার ড্রয়িংরুমে বসে উনার অতি প্রিয় বিদেশি পারফিউমের বোতলটা খুলে সারা ঘরে ছিটিয়ে দিয়েছি। খালা চিৎকার করে বললেন, "হিমু! তুই কি চাস আমি তোকে পুলিশে দিই? এই পারফিউমের দাম কত জানিস?"
আমি শান্ত গলায় বললাম, "দাম দিয়ে কী হবে খালা? ঘ্রাণটা তো অমূল্য। আর পুলিশে দিলে মন্দ হয় না। হাজতখানার দেয়ালগুলো নাকি খুব রহস্যময় হয়। সেখানে বসে আমি মহাবিশ্বের শব্দ শোনার চেষ্টা করব।"
খালা রাগে গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেলেন। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় পা রাখতেই দেখি কড়া রোদ। দুপুরের এই কাঠফাটা রোদে ঢাকা শহরটা যেন তপ্ত কড়াইয়ের মতো খাঁ খাঁ করছে। কিন্তু আমার তাতে কোনো সমস্যা নেই। মহামানবদের রোদ-বৃষ্টিতে কিছু যায় আসে না।
আমি হাঁটছি এলিফ্যান্ট রোডের দিকে। হুট করে একজনের সাথে ধাক্কা লাগল। মাঝবয়সী এক লোক, হাতে একটা বড় টিফিন ক্যারিয়ার। ধাক্কা খেয়ে তার হাত থেকে ক্যারিয়ারটা পড়ে গেল এবং ঝনঝন শব্দে ডাল-ভাত সব রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল।
লোকটা মাথায় হাত দিয়ে রাস্তায় বসে পড়লেন। তার চোখে মুখে ঘোর অন্ধকার। আমি বললাম, "ভাই সাহেব, আফসোস করবেন না। যা হওয়ার ছিল তা-ই হয়েছে। এই অন্নগুলো হয়তো রাস্তার এই ক্ষুধার্ত কাকগুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল।"
লোকটা আর্তনাদ করে উঠলেন, "কী বলছেন আপনি? আমার স্ত্রী হাসপাতালে ভর্তি। সকাল থেকে না খেয়ে আছে। অনেক কষ্ট করে এই খাবারটুকু জোগাড় করেছিলাম। এখন সে খাবে কী?"
আমি লোকটার চোখের দিকে তাকালাম। এক গভীর মমতা বোধ করলাম। বললাম, "আপনার স্ত্রীর নাম কী?"
"জরিনা।"
"জরিনা বেগম আজ রাজকীয় খাবার খাবেন। আপনি আমার সাথে আসুন।"
লোকটা অবাক হয়ে আমার পিছু নিলেন। আমার পকেটে (মানে পাঞ্জাবির ভাঁজে, কারণ পকেট তো নেই) টাকা থাকার কথা না, কিন্তু আজ সকালে বাদলকে দিয়ে একশ টাকার একটা নোট আনিয়েছিলাম। কেন আনিয়েছিলাম জানতাম না, এখন বুঝলাম।
আমি তাকে নিয়ে এক বড় রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। এক প্যাকেট গরম বিরিয়ানি আর বোরহানি কিনে তার হাতে দিলাম। লোকটা অবাক হয়ে বললেন, "আপনি কে ভাই? ফেরেশতা নাকি?"
আমি হাসলাম। "আমি হিমু। ফেরেশতারা ডানা মেলে ওড়ে, আমি খালি পায়ে হাঁটি। যান, আপনার স্ত্রীর কাছে যান। তাকে বলবেন, বিরিয়ানির ঘ্রাণে অসুখ অর্ধেক সেরে যায়।"
লোকটা চলে গেলেন। আমি আবার একা। রোদের তেজ আরও বেড়েছে। আমি এখন যাব রমনা পার্কে। সেখানে বড় একটা অশ্বত্থ গাছ আছে, যার নিচে বসে থাকলে মনে হয় সময় থমকে দাঁড়িয়েছে।
পার্কের গেটে দেখা হলো মহসিন সাহেবের সাথে। মহসিন সাহেব অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা। প্রতিদিন এখানে বসে খবরের কাগজ পড়েন। আমাকে দেখে তিনি চশমাটা নাকের ডগায় নামালেন।
"কী হিমু? আজ আবার কার সর্বনাশ করলে?"
আমি উনার পাশে বসলাম। "আজ একজনের সর্বনাশ হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলাম মহসিন সাহেব। তবে আপনার জন্য একটা খবর আছে।"
তিনি উৎসুক হয়ে বললেন, "কী খবর?"
"আপনার বড় ছেলে আজ বিকেল পাঁচটায় আপনাকে একটা সারপ্রাইজ দেবে। সে আমেরিকা থেকে ফিরছে।"
মহসিন সাহেব হোহো করে হাসলেন। "অসম্ভব! ওর সাথে সকালে কথা হলো, ও তো বলল নিউ ইয়র্কে খুব তুষারপাত হচ্ছে।"
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম, "তুষারপাত আর বিমানের ল্যান্ডিংয়ের মাঝে একটা সুতো আছে মহসিন সাহেব। সেই সুতোটা আজ আপনার বাড়ির দরজায় গিয়ে ঠেকবে। বিশ্বাস না হলে পাঁচটা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।"
আসলে আমি জানি না মহসিন সাহেবের ছেলে আসছে কি না। কিন্তু আমি চাইছিলাম এই বৃদ্ধ মানুষটা কয়েক ঘণ্টা একটা সুন্দর উত্তেজনার মধ্যে কাটান। মিথ্যা আশা কখনো কখনো সত্যি ওষুধের চেয়ে ভালো কাজ করে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। আকাশের রং বদলাচ্ছে। আমি পার্ক থেকে বের হয়ে বড় রাস্তার মোড়ে দাঁড়ালাম। হুট করে মনে হলো রূপার কথা। রূপা কি এখন তার ডায়েরিতে আমার নামে গালাগালি লিখছে? নাকি সে নীল রঙের একটা শাড়ি পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে?
হিমুদের জীবনে রূপা এক অদ্ভুত ধ্রুবক। সে আছে বলেই হিমু হওয়াটা এত সার্থক মনে হয়। রূপাকে এক নজর দেখার ইচ্ছা হলো, কিন্তু আমি গেলাম না। ইচ্ছাকে দমন করাটাই মহামানব হওয়ার সবচেয়ে কঠিন ধাপ।
রাতের অন্ধকার নামতেই আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম। শহরের আলো-আঁধারি খেলায় আমি এক যাযাবর। আমার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই, কোনো পিছুটান নেই। শুধু আছে বাবার দেওয়া সেই মহামানব হওয়ার নেশা।
রাস্তার এক কোণে একটা কুকুর শুয়ে আছে। আমি তার পাশে বসলাম। কুকুরটা লেজ নাড়ল। আমি বিড়বিড় করে বললাম, "বুঝলি রে বাঘা, মানুষ হওয়া খুব কষ্টের কাজ। তার চেয়ে তুই অনেক ভালো আছিস। তোর কোনো পাঞ্জাবি নেই, কোনো রূপা নেই, আর চাকরি পাবার টেনশনও নেই।"
কুকুরটা ডাকল, যেন সে আমার কথা বুঝতে পেরেছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। সামনের রাস্তাটা অনেক লম্বা। এই রাস্তা ধরে কতদূর যাওয়া যায়? হয়তো মহাবিশ্বের শেষ সীমানা পর্যন্ত, কিংবা হয়তো মোড়ের ঐ চায়ের দোকানটা পর্যন্ত।
হিমুদের জন্য দুটোই সমান।


No comments