রহস্যময় পুরনো বাতিঘর
'তিন গোয়েন্দা'র সেই চিরচেনা রোমাঞ্চ আর রহস্যের আবহে রচিত।
রহস্যময় পুরনো বাতিঘর
১.
রকি বিচের আকাশটা আজ একটু মেঘলা। সাগরের ঢেউগুলো সজোরে আছড়ে পড়ছে উপকূলে। তিন বন্ধু—কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন হফম্যান—বসে আছে তাদের গোপন সদর দপ্তরে। হঠাৎ কিশোরের হাতে এল একটি পুরনো চিরকুট। চিরকুটটি পাওয়া গেছে পুরনো এক সিন্দুকের তলায়। তাতে লেখা: "নীল জলের যেখানে শেষ, সেখানে পাথুরে পাহাড়ে লুকানো আছে রূপালী রাতের আলো।"
কিশোর তার চিবুক ঘষতে ঘষতে বলল, "মুসা, রবিন! কেসটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। নীল জলের শেষ মানে হলো সাগরের কিনারা, আর পাথুরে পাহাড় বলতে নির্ঘাত ওই পরিত্যক্ত বাতিঘরটাকে বোঝানো হয়েছে।"
মুসা একটু ভয়ে ভয়ে বলল, "কিন্তু কিশোর, ওই বাতিঘর নিয়ে তো কত কথা শোনা যায়! লোকে বলে ওখানে মাঝরাতে অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়।"
রবিন চশমাটা নাক বরাবর ঠেলে দিয়ে বলল, "ভয় পেয়ো না মুসা। আমরা তিন গোয়েন্দা। রহস্য যেখানে, আমরা সেখানে!"
২.
বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসার আগেই তারা সাইকেলে চড়ে রওনা দিল সেই পরিত্যক্ত বাতিঘরের দিকে। জায়গাটা শহরের মূল লোকালয় থেকে বেশ দূরে। জীর্ণ বাতিঘরটি পাহাড়ের মাথায় একাকী দাঁড়িয়ে আছে, যেন কোনো অতিকায় দানব আকাশপানে চেয়ে আছে।
তারা যখন পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছাল, তখন চারপাশ নিঝুম হয়ে গেছে। শুধু সমুদ্রের গর্জন আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। বাতিঘরের সদর দরজাটা ভাঙাচোরা। কিশোর টর্চ বের করে ভেতরে আলো ফেলল। চারদিকে মাকড়সার জাল আর ধুলোর আস্তর।
৩. অদ্ভুত শব্দ!!
হঠাৎ ওপর তলা থেকে একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দ হলো—ধপ!
মুসা লাফিয়ে উঠল, "আমি বলেছিলাম না! এখানে কিছু একটা আছে!"
কিশোর ইশারায় সবাইকে চুপ থাকতে বলল। তারা সাবধানে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। সিঁড়িগুলো প্রতি পদক্ষেপে মড়মড় করে শব্দ করছিল। দোতলায় পৌঁছে তারা দেখল এক বিশাল ঘর। সেখানে পুরনো কিছু ভাঙা আসবাবপত্র পড়ে আছে। হঠাৎ রবিন লক্ষ্য করল, মেঝের এক জায়গায় ধুলো নেই, যেন কেউ সম্প্রতি সেখান দিয়ে কিছু টেনে নিয়ে গেছে।
"দেখো বন্ধুরা," রবিন নিচু স্বরে বলল, "এখানে কেউ ছিল।"
৪.
কিশোর দেয়ালের এক জায়গায় টোকা দিল। শব্দটা ফাঁপা মনে হলো। সে একটু জোরে চাপ দিতেই দেয়ালের একটা অংশ ভেতরে ঢুকে গেল। বেরিয়ে এল এক গোপন কুঠুরি। ভেতরে ঢুকে তারা যা দেখল, তাতে তাদের চোখ ছানাবড়া! সেখানে কোনো ভূত নেই, বরং রয়েছে আধুনিক কিছু ট্রান্সমিটার আর ওয়াকিটকি।
কিশোর বুদ্ধিদীপ্ত হাসি হেসে বলল, "বুঝেছি! এটা কোনো ভূতের কারবার নয়। পাচারকারীরা এই পরিত্যক্ত বাতিঘরকে তাদের গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা এখান থেকে সাগরে থাকা জাহাজে সংকেত পাঠায়।"
৫.
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় ছায়া দেখা দিল। একজন লোক রুক্ষ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, "কে এখানে? আমার আস্তানায় কারা ঢুকেছে?"
তিন গোয়েন্দা দ্রুত জানালার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। লোকটা ভেতরে আসতেই মুসা তার ফুটবলার শরীরের শক্তি দিয়ে লোকটাকে ঝাপটে ধরল। কিশোর আর রবিন মিলে দড়ি দিয়ে লোকটাকে বেঁধে ফেলল। লোকটা আসলে ছিল কুখ্যাত চোরাকারবারী ব্ল্যাক জ্যাক, যাকে পুলিশ অনেকদিন ধরে খুঁজছিল।
কিশোর পকেট থেকে তার কার্ডটা বের করল:
তিন গোয়েন্দা তদন্তকারী: কিশোর পাশা, মুসা আমান, রবিন হফম্যান
সে মুচকি হেসে বলল, "মুসা, এবার পুলিশকে ফোন করো। আমাদের আজকের অ্যাডভেঞ্চার এখানেই সফল!"
---
রাত গভীর হওয়ার আগে পুলিশ এসে ব্ল্যাক জ্যাককে নিয়ে গেল। রকি বিচের সার্জন মুচকি হেসে তিন বন্ধুকে ধন্যবাদ জানালেন। বাতিঘর থেকে ফেরার পথে মুসা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "যাক বাবা, কোনো ভূত ছিল না! এখন চলো, দ্রুত বাড়ি গিয়ে পেটে কিছু দেওয়া দরকার।"
তিন বন্ধু হাসতে হাসতে সাইকেল চালিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। পেছনে পড়ে রইল রহস্য সমাধান হওয়া সেই শান্ত বাতিঘর।
.jpg)

No comments